সরকার আইএমএফের বড় ঋণ পেতে রাজস্ব পরিকল্পনা ঠিক করছে প্রকাশিত: ৫:০৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৫, ২০২৬ নিজস্ব প্রতিবেদক : অর্থনীতির চাপ সামাল দিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের নতুন ঋণ নিতে চায় সরকার। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, দুর্বল রাজস্ব আদায়, ব্যাংকিং খাতের সংকট ও বাজেটের বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে নতুন অর্থায়ন পেতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আইএমএফের কাছ থেকে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ১৫ দিনের সফরে ঢাকায় আসার কথা রয়েছে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের। অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, সফরে আইএমএফের প্রতিনিধিরা অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির সংস্কার নিয়ে আলোচনা হবে। নতুন ঋণ কর্মসূচির আগে বাংলাদেশের রাজস্ব পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে আইএমএফ। এনবিআর যে রাজস্ব পরিকল্পনা পাঠিয়েছে, সেটি পর্যালোচনা করে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল ও কর্মপরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরে কোন কোন খাত থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা হবে, নতুন করদাতা কীভাবে শনাক্ত করা হবে, করজাল কীভাবে বাড়ানো হবে এবং রাজস্ব প্রশাসনের অটোমেশনে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে এনবিআরের প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। এ কারণে প্রতিবেদনটিকে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা হিসেবে গ্রহণ করেনি আইএমএফ। প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসার আগেই পরিকল্পনার ঘাটতি পূরণ করে নতুন কর্মপরিকল্পনা তৈরির চেষ্টা চলছে। এ জন্য এনবিআরের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ বিভাগ। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কীভাবে রাজস্ব আদায় বাড়াবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছিল আইএমএফ। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন পাঠায়। তবে ওই প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগের বিস্তারিত থাকলেও আগামী অর্থবছরের রাজস্ব কৌশল যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। নতুন রাজস্বের সম্ভাব্য খাত চিহ্নিত করা, নতুন করদাতা শনাক্ত করা, করজাল সম্প্রসারণে আইনি ও প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং ডিজিটাল অটোমেশনের সময়সীমা নিয়েও বিস্তারিত পরিকল্পনা দেওয়া হয়নি। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় আইএমএফ এ নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে। ই-মেইলের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়কে সংস্থাটির মতামত জানানো হয়েছে। মিশন আসার আগে রাজস্ব পরিকল্পনার ঘাটতি পূরণ করাই এখন অর্থ বিভাগ ও এনবিআরের অন্যতম প্রধান কাজ। নতুন করদাতা শনাক্তকরণ, কর ফাঁকি কমানো, করজাল সম্প্রসারণ ও রাজস্ব প্রশাসনের অটোমেশন নিয়ে পরিকল্পনায় কীভাবে সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে আসন্ন বৈঠকে আলোচনা হতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো পরিকল্পনা নিয়ে আইএমএফ কোনো অসন্তোষ জানায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আইএমএফের আসন্ন সফরে ব্যাংকিং খাতও গুরুত্ব পাবে। খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এবং আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। গত জুলাইয়ে ঢাকার সফর শেষে আইএমএফ বলেছিল, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে চাপ এখনো বেশি। ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছিল সংস্থাটি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তা নিয়েও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। আইএমএফের জুলাইয়ের মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, উচ্চ পণ্যমূল্য ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। এতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বেড়েছে। আর্থিক সক্ষমতা তৈরিতে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ সভাকে সামনে রেখে আইএমএফের কাছে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণের বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের কাছেও বাজেট সহায়তাসহ জ্বালানি, খাদ্য, ব্যাংকিং ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থায়ন চাওয়া হবে। ঋণের দরজা খুলতে এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। সামনে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম সমন্বয়, রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও ভর্তুকি কমানোর মতো বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। সরকারের লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ চুক্তি চূড়ান্ত করা। এরপর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আগামী বছরের শুরুতে প্রথম কিস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন ঋণ কর্মসূচির প্রস্তুতিতে অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগ কাজ করছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে আইএমএফের প্রতিনিধিদলের বৈঠকের জন্য বাংলাদেশের এজেন্ডা চূড়ান্ত করা হবে। এতে রাজস্ব আদায়, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ভর্তুকি ও ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য-উপাত্ত দেওয়া হবে। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও নতুন অর্থায়নের প্রস্তুতি রয়েছে। বাজেট সহায়তার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য ও সার আমদানি, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও জলবায়ু মোকাবিলায় অর্থ চাওয়া হতে পারে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় অঙ্কের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। নতুন কর্মসূচিতে সরকার শুধু বড় অঙ্কের ঋণ পাওয়ার দিকে নজর দিচ্ছে না। ঋণের পাশাপাশি অর্থনীতির সংস্কার কাঠামো নিয়েও আলোচনা হবে। ব্যাংককের বার্ষিক সভায় মূলত ঋণের আকার, সংস্কারের রূপরেখা ও অর্থছাড়ের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন করে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সংস্কার কার্যক্রম দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে আইএমএফ। কিন্তু সরকারের সংস্কারে তেমন গতি নেই। এনবিআরের পৃথকীকরণেও অগ্রগতি নেই। ড. জাহিদ হোসেন বলেন, শুধু ঋণ পেলেই বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটবে না। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি। নতুন ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যবহার হবে এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কীভাবে বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: