হোমল্যান্ড লাইফে গ্রাহকের টাকা অনিশ্চিত, বিতর্কিত এমডি নিয়োগের তোড়জোড়! প্রকাশিত: ১:৫৩ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২৬ শেখ মনিরুল ইসলাম,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও কমিশন বকেয়া, বিপুল আর্থিক দায় এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যেই নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের তোড়জোড় শুরু হয়েছে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট যখন ক্রমেই প্রকট হচ্ছে, ঠিক তখনই প্রস্তাবিত এমডির যোগ্যতা ও অতীত রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন থাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন নথি, লিখিত চিঠিপত্র, কমিশন-সংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পর্যালোচনায় হোমল্যান্ড লাইফের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির মোট দায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের বিভিন্ন দাবি বাবদ প্রায় ২০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘ পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে অনেক গ্রাহক তাদের বিমা দাবি আদায় করতে পারছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—গ্রাহকের বিপুল পাওনা পরিশোধে যেখানে সংকট, সেখানে নতুন এমডি নিয়োগে এত তাড়াহুড়ো কেন? ২০ আগস্টের পর হোমল্যান্ড লাইফের নেতৃত্বে কে? গত প্রায় এক বছর সরকার মনোনীত একজন তত্ত্বাবধায়ক হোমল্যান্ড লাইফের দায়িত্বে ছিলেন। আগামী ২০ আগস্ট তার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই নতুন এমডি নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। সংশ্লিষ্ট নথি ও সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন খান চৌধুরীকে এমডি হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে পাঁচজন পরিচালকের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান ও প্রার্থীর যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাঁচ পরিচালকের সিদ্ধান্তেই কি এমডি? হোমল্যান্ড লাইফের পরিচালনা পর্ষদে মোট ৩৪ জন পরিচালক থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিচালক দেশের বাইরে অবস্থান করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।দেশে অবস্থানকারী অন্য কয়েকজন পরিচালকগণ ইতিমধ্যে তাদের আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠিয়েছেন। এমন অবস্থায় মাত্র পাঁচজন পরিচালকের সিদ্ধান্তে এমডি নিয়োগের উদ্যোগ কতটা বিধিসম্মত এবং কোম্পানির সামগ্রিক পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা এখন খতিয়ে দেখার বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক সংকটে থাকা একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর পূর্ববর্তী কর্মস্থলের রেকর্ড, পেশাগত যোগ্যতা, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা উচিত। প্রস্তাবিত এমডির অতীত নিয়ে অভিযোগ আমজাদ হোসেন খান চৌধুরীর পূর্ববর্তী কর্মজীবন নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি এর আগে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। কোম্পানির গাড়ি বিক্রি, অফিসের ডেকোরেশন এবং বিভিন্ন কাজ ও মেরামতের অর্থ পরিশোধে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পর তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলে সূত্রটির দাবি করেছে। আইডিআরএর বিধি মানা হচ্ছে তো? নতুন এমডি নিয়োগের প্রক্রিয়ায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী কর্মস্থলে বহিষ্কার বা গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে নিয়োগের উপযুক্ততা নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। ভুক্তভোগী গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, হোমল্যান্ড লাইফের মতো আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানে নতুন এমডি নিয়োগের আগে আইডিআরএর পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ যাচাই হওয়া উচিত। সরকারের ১২৯ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব পাওনা? অনুসন্ধানে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নথিতে হোমল্যান্ড লাইফের আর্থিক অবস্থার আরও একটি দিক সামনে এসেছে। কর কমিশনের একটি চিঠি, নং ২০২৫/২৬/৩৫২/৩৫১, এর সূত্র অনুযায়ী কোম্পানিটির কাছে সরকারের প্রায় ১২৯ কোটি ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৮৯১ টাকা রাজস্ব পাওনা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এত বড় অঙ্কের রাজস্ব বকেয়া থাকলে কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে এ পাওনার বর্তমান অবস্থা, কোন কোন করবর্ষের জন্য তা প্রযোজ্য এবং পরিশোধের অগ্রগতি—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। গ্রাহকের দাবি—বছরের পর বছর টাকা মিলছে না হোমল্যান্ড লাইফের একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে তাদের বিমা দাবি পরিশোধ করা হচ্ছে না। অনেক গ্রাহক অফিসে যোগাযোগ করেও সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। এক ভুক্তভোগী বলেন, “বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দিয়েছি। এখন দাবি পাওয়ার সময় হয়েছে, কিন্তু টাকা পাচ্ছি না। আমরা জানতে চাই—আমাদের টাকা কোথায়?” শুধু গ্রাহক নয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিয়মিত অফিস করেও অনেকে বেতন-ভাতা ও কমিশন সময়মতো পাচ্ছেন না। যমুনা ব্যাংকে ৪১ কোটি টাকার এফডিআর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মতিঝিলের যমুনা ব্যাংকে হোমল্যান্ড লাইফের নামে প্রায় ৪১ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। এই অর্থের বর্তমান অবস্থা কী, কার অনুমোদনে তা পরিচালিত হচ্ছে এবং গ্রাহকের দাবি পরিশোধে অর্থটি ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। আর্থিক সংকটে থাকা একটি বীমা প্রতিষ্ঠানের আমানত ও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ স্বচ্ছতা থাকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বেতন-কমিশন বকেয়া—ক্ষোভ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হোমল্যান্ড লাইফের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাদের বেতন, ভাতা ও কমিশন নিয়ে অনিশ্চয়তা চলছে। যারা প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে অফিস করছেন, তাদের প্রশ্ন—কোম্পানির আর্থিক সংকটের দায় কেন কর্মীদের বহন করতে হবে? কর্মীদের প্রাপ্য পরিশোধ না করে নতুন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগের এমডি নিয়োগও ছিল বিতর্কিত হোমল্যান্ড লাইফে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এর আগে আব্দুল মতিন নামে একজনকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে তার শিক্ষাগত সনদ জাল থাকার অভিযোগে আদালতের মামলায় তিনি দণ্ডিত হন বলে সূত্রটি দাবি করেছে। এরপর আরেক বিতর্কিত আওয়ামীলীগ নেতা আসলাম রেজাকে এমডি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপত্তির মুখে সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এখন আবার নতুন করে প্রস্তাবিত এমডির অতীত নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শেয়ার লেনদেনেও প্রশ্ন অনুসন্ধানে পরিচালক জুলহাস উদ্দিনের শেয়ার প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যে ক্রয়-সংক্রান্ত তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। সূত্রটির দাবি, বর্তমান চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন মুকাদ্দাস এবং সাবেক চেয়ারম্যান তাহের হোসেন-এর সঙ্গে এ শেয়ার লেনদেনের বিষয়টি সম্পর্কিত। শেয়ার হস্তান্তর বা ক্রয়-বিক্রয় কোন তারিখে, কী মূল্যে, কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে এবং কার স্বার্থে হয়েছে—তা যাচাই করা প্রয়োজন। এখন নজর আইডিআরার দিকে হোমল্যান্ড লাইফের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা। গ্রাহকের বকেয়া দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-কমিশন, কোম্পানির মোট দায়, রাজস্ব বকেয়া, এফডিআর, সম্পদ ও শেয়ার লেনদেন এবং নতুন এমডি নিয়োগ—সব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে আইডিআরার পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন—নতুন এমডি নিয়োগের আগে কি আইডিআরএ সব নথি যাচাই করবে? প্রার্থীর অতীত কর্মজীবন খতিয়ে দেখবে? নাকি পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে যাবে? শেষ প্রশ্ন—হোমল্যান্ড লাইফের গ্রাহকের টাকা কবে? হোমল্যান্ড লাইফের সংকটের কেন্দ্রে এখন কোনো ব্যক্তি নন—আছেন হাজার হাজার গ্রাহক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পাওনা। গ্রাহকদের একটাই প্রশ্ন—“আমাদের টাকা কবে পাব?” কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশ্ন, আমাদের বেতন ও কমিশন কবে পরিশোধ হবে?” আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে প্রশ্ন এত অভিযোগ ও নথির পরও কি নতুন করে বিতর্কিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হবে?” হোমল্যান্ড লাইফে নতুন এমডি নিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, বকেয়া দাবি, প্রার্থীর যোগ্যতা ও অতীত রেকর্ড, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন—সবকিছু স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত শুধু কোম্পানিকে নয়, দিতে হতে পারে হাজার হাজার গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। এখন দেখার বিষয়—হোমল্যান্ড লাইফে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেয় আইডিআরএ, নাকি নতুন এমডি নিয়োগকে ঘিরে শুরু হয় বিতর্কের আরেক অধ্যায়। News PhotoCard SHARES সারা বাংলা বিষয়: