বীমা দাবি পরিশোধে আইডিআরএ’র নতুন গতি: চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনের উদ্যোগে দুই ধাপে ৮,৪১৭ গ্রাহকের ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ প্রকাশিত: ৭:২৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ এম হোসাইন আহমদ, বিশেষ প্রতিবেদকঃ দীজ বিবেচিত হয়ে আসছে গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা। বিশেষ করে কয়েীকটি দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত জীবন বীমা কোম্পানির হাজার হাজার গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে তাদের বৈধ পাওনা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। এতে একদিকে গ্রাহকদের আর্থিক দুর্ভোগ বেড়েছে, অন্যদিকে বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই দীর্ঘদিনের জট খুলতে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নাভিন দায়িত্ব নেওয়ার পর বকেয়া ও দীর্ঘদিনের বৈধ বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র দুই ধাপে ৮ হাজার ৪১৭ জন গ্রাহকের ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ টাকা বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। এই উদ্যোগকে বীমা খাতের দীর্ঘদিনের দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আইডিআরএ জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ ও বকেয়া দাবিগুলো ধাপে ধাপে পরিশোধের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। আগে কোথায় ছিল বীমা খাত আইডিআরএর ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, জীবন বীমা খাতে মোট দাবির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৮১২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এরমধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৪১০ কোটি ১২ লাখ টাকা, অর্থাৎ ৬৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ, তখনও নিষ্পত্তি হয়নি। অর্থাৎ বছরের শুরুতেই জীবন বীমা খাতে বিপুল পরিমাণ দাবি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তথ্যেও প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের কাছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর আইডিআরএর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়—দীর্ঘদিনের বকেয়া বৈধ দাবি কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায় এবং একই সঙ্গে গ্রাহকদের আস্থা কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়। সেই লক্ষ্যেই শুরু হয় বিশেষ উদ্যোগ প্রথম ধাপে ২,৫৪৯ গ্রাহকের ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা বিশেষ উদ্যোগের প্রথম ধাপে গত ৩ সেপ্টেম্বর সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির ২ হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহকের দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি নিষ্পত্তি করা হয়। এ সময় মোট ১৪ কোটি ৫১ লাখ ৩ হাজার ১৪৬ টাকা ৫৮ পয়সা পরিশোধ করা হয়। ৯৪টি চেকের মাধ্যমে এসব টাকা গ্রাহকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রথম ধাপে যেসব কোম্পানির গ্রাহকরা টাকা পেয়েছেন, সেগুলো হলো—বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রথম ধাপের পরিশোধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— ফারইস্ট ইসলামী লাইফ: ৫২৮ গ্রাহক, ৫ কোটি ৪২ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৯ টাকা প্রগ্রেসিভ লাইফ: ১ হাজার ৩৫০ গ্রাহক, ৬ কোটি ৯০ লাখ ৩২ হাজার ১৬৫ টাকা ৫৮ পয়সা পদ্মা ইসলামী লাইফ: ৬২৪ গ্রাহক, ১ কোটি ৯৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ টাকা হোমল্যান্ড লাইফ: ১৫ গ্রাহক, ১০ লাখ ৬৬ হাজার ১৯১ টাকা সানফ্লাওয়ার লাইফ: ২০ গ্রাহক, ৫ লাখ ২১ হাজার ২৬৬ টাকা বায়রা লাইফ: ৮ গ্রাহক, ৪ লাখ ৫১ হাজার ৮২৬ টাকা গোল্ডেন লাইফ: ৪ গ্রাহক, ২ লাখ ৫১ হাজার ৪৭৬ টাকা। প্রথম ধাপেই দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকা ২ হাজার ৫৪৯ গ্রাহক তাদের বৈধ পাওনা হাতে পান। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৫,৮৬৮ গ্রাহক প্রথম ধাপের পরই থেমে থাকেনি কার্যক্রম। এর ধারাবাহিকতায় ১৪ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় ধাপে আরও ৫ হাজার ৮৬৮ জন গ্রাহকের দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি নিষ্পত্তি করা হয়। এ ধাপে মোট ২৩ কোটি ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭১ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে পাঁচটি জীবন বীমা কোম্পানির গ্রাহকরা এই অর্থ পেয়েছেন। এর মধ্যে— পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৩ হাজার ৬০০ গ্রাহককে প্রায় ১২ কোটি টাকা। হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স ১ হাজার ১৪৫ গ্রাহককে ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৫৮০ গ্রাহককে ৫ কোটি টাকা। সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৩০০ গ্রাহককে ৫৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স ২৪৩ গ্রাহককে ৫০ লাখ ১৮ হাজার ৪৫৭ টাকা। দুই ধাপে হিসাবটা কী দাঁড়াল? দুটি ধাপ একসঙ্গে হিসাব করলে চিত্রটি বেশ স্পষ্ট। ধাপ গ্রাহক পরিশোধিত অর্থ প্রথম ধাপ ২,৫৪৯ জন ১৪,৫১,০৩,১৪৬.৫৮ টাকা দ্বিতীয় ধাপ ৫,৮৬৮ জন ২৩,০৩,৫৬,৯৭১ টাকা মোট ৮,৪১৭ জন ৩৭,৫৪,৬০,১১৭.৫৮ টাকা অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের দুই ধাপে মোট ৮ হাজার ৪১৭ জন গ্রাহকের ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ টাকা ৫৮ পয়সা বীমা দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। আইডিআরএ জানিয়েছে, যেসব বৈধ দাবি এখনো পরিশোধ হয়নি, সেগুলো যাচাই-বাছাই ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ধাপে ধাপে নিষ্পত্তি করা হবে। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এই অর্থ পরিশোধ? এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন সম্পদ ও সিকিউরিটি বন্ডসহ বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থের ব্যবস্থা করে দীর্ঘদিনের বৈধ দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু কোম্পানিগুলোর স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে, আটকে থাকা বৈধ দাবির বিপরীতে সম্পদ ও আর্থিক উৎস কাজে লাগানোর মাধ্যমে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার একটি কার্যকর প্রক্রিয়া সামনে এসেছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে টাকা না পাওয়া গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে আশার সৃষ্টি হয়েছে। আস্থার সংকট থেকে আস্থা ফেরানোর পথে বীমা ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো আস্থা। একজন গ্রাহক বছরের পর বছর প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন এই প্রত্যাশায় যে চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনের সময় তিনি তার প্রাপ্য অর্থ পাবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন দাবি নিষ্পত্তি না হলে সেই আস্থায় আঘাত লাগে। ফলে বীমা খাতের সমস্যা কেবল একটি কোম্পানি বা একজন গ্রাহকের সমস্যা থাকে না; এর প্রভাব পড়ে পুরো শিল্পের ওপর। আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নাভিনও দাবি নিষ্পত্তিতে গতি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠন করা যায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। সেপ্টেম্বরের দুই ধাপের উদ্যোগ তাই শুধু ৩৭ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি নতুন কর্মপদ্ধতিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি বাস্তবতাও হলো—বীমা খাতে বকেয়া দাবির পরিমাণ এখনো অনেক বড়। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের হিসাবে জীবন বীমা খাতে প্রায় ৪ হাজার ৪১০ কোটি ১২ লাখ টাকা দাবি অপরিশোধিত ছিল। সেপ্টেম্বরের দুই ধাপে ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, দীর্ঘদিনের জমে থাকা দাবির জট কাটাতে কাজ শুরু হয়েছে; তবে পুরো বকেয়া নিষ্পত্তির জন্য আরও বড় পরিসরে এবং ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। এ কারণে বর্তমান উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে—এটি এককালীন কোনো কার্যক্রম না হয়ে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে এগিয়ে নেওয়া। আইডিআরএও জানিয়েছে, বাকি বৈধ দাবিগুলো যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তি করা হবে। পুরোনো বকেয়া থেকে নতুন গতির পথে একদিকে যখন বছরের শুরুতে জীবন বীমা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া ছিল, অন্যদিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর আইডিআরএর নেতৃত্বে সেপ্টেম্বরেই দুই ধাপে ৮ হাজারের বেশি গ্রাহকের হাতে টাকা পৌঁছেছে। সংখ্যার বিচারে—৪,৪১০ কোটি ১২ লাখ টাকা ছিল ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে জীবন বীমা খাতের অপরিশোধিত দাবির পরিমাণ। আর সাম্প্রতিক দুই ধাপে— ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ টাকা পরিশোধ হয়েছে। সুবিধা পেয়েছেন—৮ হাজার ৪১৭ জন গ্রাহক। এটি মোট বকেয়ার তুলনায় এখনও ছোট অংশ। কিন্তু দীর্ঘদিনের বকেয়া নিষ্পত্তিতে যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ একটি বড় সমস্যার সমাধান সাধারণত একদিনে হয় না; প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ, যাচাই, অর্থের সংস্থান এবং নিয়মিত পরিশোধ। সামনে আরও বড় পরিসরে দাবি নিষ্পত্তির প্রত্যাশা বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বৈধ দাবিগুলো ধাপে ধাপে নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, দাবি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকসেবায় আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। আইডিআরএর বর্তমান উদ্যোগের বড় সাফল্য হবে তখনই, যখন সেপ্টেম্বরের এই দুই ধাপের পর আরও বড় সংখ্যক গ্রাহকের কাছে তাদের বৈধ পাওনা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। কারণ বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু টাকা নয়—গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থা পুনর্গঠনের পথে সেপ্টেম্বরের দুই ধাপে ৮ হাজার ৪১৭ গ্রাহকের ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ নিঃসন্দেহে একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি। এখন এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত ও ধারাবাহিক করার মধ্য দিয়েই দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবির বড় জট কাটানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। হিসাবের সারাংশ ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক: জীবন বীমা খাতে মোট দাবি — ৬,৮১২.৬৭ কোটি টাকা অপরিশোধিত দাবি — ৪,৪১০.১২ কোটি টাকা অপরিশোধিত দাবির হার — ৬৪.৭৩ শতাংশ। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ২,৫৪৯ গ্রাহক — ১৪.৫১ কোটি টাকা। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ৫,৮৬৮ গ্রাহক — ২৩.০৩ কোটি টাকা। দুই ধাপে মোট: ৮,৪১৭ গ্রাহক — ৩৭.৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দায়িত্ব নেওয়ার পর দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ইতোমধ্যে হাজার হাজার গ্রাহক তাদের আটকে থাকা বৈধ পাওনা হাতে পেয়েছেন। এখন প্রত্যাশা—এই ধারাবাহিকতা আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে এবং ধাপে ধাপে বীমা খাতের দীর্ঘদিনের দাবি জট অনেকটাই কমে আসবে। News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: