অগ্রণী ব্যাংকের লকার থেকে ৩ কোটি টাকার স্বর্ণ উধাওয়ের অভিযোগ প্রকাশিত: ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬ নিজস্ব প্রতিনিধি : অগ্রণী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখার একটি লকার থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার উধাও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কানাডাপ্রবাসী এক নারী অভিযোগ করেছেন, তার সই জাল করে ভুয়া ঘোষণাপত্র তৈরি করে লকারটি খোলা হয়। পরে তার ও তার মায়ের গচ্ছিত স্বর্ণালংকার বের করে নেওয়া হয়েছে। শুধু স্বর্ণালংকার নয়, তার সই করা দুটি চেক ব্যবহার করে ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি। এসব ঘটনায় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ থাকতে পারে বলে অভিযোগ করেছেন ফারজানা রহমান লিমা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কমন সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তিনি এসব কথা উল্লেখ করেছেন। অভিযোগের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি তদন্ত বা অডিট টিম গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অভিযোগটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত করে দেখবে। পাশাপাশি অগ্রণী ব্যাংকের কাছেও এ বিষয়ে জবাব চাওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লকারে ছিল প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকার স্বর্ণ ফারজানা রহমানের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, তিনি ও তাঁর স্বামী ২০১৯ সালের ১৫ জুন কানাডায় চলে যান। বিদেশ যাওয়ার আগে অগ্রণী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখায় তার মায়ের নামে থাকা ৪০৯ নম্বর লকারে নিজের স্বর্ণালংকার রেখে যান তিনি। ওই লকারে তাঁর মায়ের স্বর্ণালংকারও ছিল। ফারজানার হিসাবে, লকারে থাকা তাঁর স্বর্ণালংকারের বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তার মায়ের স্বর্ণালংকারের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুটি মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার লকারে ছিল বলে দাবি তাঁর। ফারজানার মা হোস্নে জাহান ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মারা যান। তখন কানাডায় থাকায় মায়ের মৃত্যুর পর দেশে আসতে পারেননি ফারজানা। ২০১৯ সালের জুনে দেশ ছাড়ার পর চলতি বছরের ১২ আগস্ট তিনি প্রথমবার দেশে ফেরেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন। সই জাল করে ঘোষণাপত্র তৈরির অভিযোগ ফারজানার অভিযোগ, মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর বোন ফারহানা রহমান লকার পরিচালনার জন্য ব্যাংকে আবেদন করেন। এরপর তাঁর সই জাল করে একটি ‘মিথ্যা ঘোষণাপত্র’ তৈরি করা হয়। ওই ঘোষণাপত্র ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ব্যাংকে জমা দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ফারজানার দাবি, ব্যাংক তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই ওই জাল সই ও ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতে তাঁর বোনকে লকার খোলার সুযোগ দেয়। পরে কোনো বৈধ উত্তরাধিকারসংক্রান্ত প্রক্রিয়া ছাড়াই তার ও তার মায়ের স্বর্ণালংকার লকার থেকে বের করে নেওয়া হয়। চলতি বছরের ২৪ আগস্ট ব্যাংকে গিয়ে বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান ফারজানা। তখন তিনি জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর লকার থেকে স্বর্ণালংকার বের করে নেওয়ার পর লকারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরে এ বিষয়ে ব্যাংকের কাছে লিখিতভাবে জানতে চান তিনি। সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে কিছু নথির অনুলিপিও সংগ্রহ করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন। অভিযোগ অস্বীকার বোনের ফারহানা রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তার কাছে বোনের সই করা একটি নথির প্রিন্ট কপি রয়েছে। তবে নথিটির মূল কপি কীভাবে তার হাতে এসেছে, তা তিনি জানেন না। লকার থেকে ফারজানা ও তার মায়ের স্বর্ণালংকার বের করে নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন ফারহানা। তার দাবি, বোনের গয়নার একটি বাক্স তার কাছে রয়েছে এবং সেটি অন্য একটি ব্যাংকের লকারে রাখা হয়েছে। তিনি এখনো সেই লকার খুলে দেখেননি। দুটি চেকে ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা ফারজানা তার অভিযোগে আরও বলেছেন, বিদেশ যাওয়ার আগে মায়ের দৈনন্দিন ও জরুরি খরচ মেটানোর জন্য দুটি চেকে সই করে রেখে গিয়েছিলেন। পরে ওই চেক বইয়ের দুটি পাতা ব্যবহার করে চলতি বছরের ২৭ জুলাই ও ৩ আগস্ট ব্যাংকের পৃথক দুটি শাখা থেকে টাকা তোলা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি চেকের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা এবং অন্যটি দিয়ে ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ফারহানার প্রতিনিধি হিসেবে ফাহমিদা ও সামিয়া ওই টাকা তুলেছেন বলে অভিযোগ করেছেন ফারজানা। এ অভিযোগও অস্বীকার করেছেন ফারহানা। তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে বোন দেশের সম্পদ বা লকারের বিষয়ে তাকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে যাননি। বোনের চেক জালিয়াতির অভিযোগেরও কোনো ভিত্তি নেই। ব্যাংকের তদন্ত অগ্রণী ব্যাংকের এমডি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি ব্যাংকের নজরে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে একটি তদন্ত বা অডিট টিম গঠন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তদন্ত না করে এর সত্য-মিথ্যা কোনোটিই বলা সম্ভব নয়।’ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা হবে না বলেও জানান তিনি। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকৃত বিষয়টি পরিষ্কার হবে। জবাব চাইবে বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অভিযোগটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে। পাশাপাশি অগ্রণী ব্যাংকের কাছেও জবাব চাওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। ফারজানা রহমানের প্রশ্ন, তিনি বিদেশে থাকা অবস্থায় তার স্বর্ণালংকার কীভাবে লকার থেকে বের করা হলো এবং তার অনুপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও ব্যাংকিং কার্যক্রম কীভাবে সম্পন্ন হলো। লকার পরিচালনা, স্বর্ণালংকার উত্তোলন ও ঘোষণাপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি। News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: