তিন মাসেই ২২ জীবন বীমা কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যয় ২৭ কোটি টাকা প্রকাশিত: ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০২৬ নিজস্ব প্রতিবেদক : জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফেরেনি। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দেশের ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মধ্যে ২২টি অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এসব কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে ৯০২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অথচ একই সময়ে অনুমোদিত ব্যয়ের সীমা ছিল ৮৭৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসেই সীমার চেয়ে প্রায় ২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এর আগে ২০২৫ সালেও পুরো জীবন বীমা খাতে অনুমোদিত সীমার চেয়ে ২১৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছিল। আইডিআরএর নির্ধারিত সীমার চেয়ে ব্যয় বেশি করার ঘটনা দীর্ঘদিনের। অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার কোম্পানিগুলোকে সতর্ক ও নির্দেশনা দেওয়া হলেও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি। ফলে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা নির্ধারণের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে অনুমোদিত সীমার চেয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে মেটলাইফ বাংলাদেশ। কোম্পানিটির প্রকৃত ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে ২৬৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। বিপরীতে অনুমোদিত সীমা ছিল ২৫৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অর্থাৎ সীমার চেয়ে ১১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ২০২৫ সালে মেটলাইফের চিত্র ছিল ভিন্ন। ওই বছর কোম্পানিটি অনুমোদিত সীমার চেয়ে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা কম ব্যয় করেছিল। অতিরিক্ত ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা ছিল ৩৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বিপরীতে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৪৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ফলে সীমার চেয়ে ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অনুমোদিত ব্যবস্থাপনা ব্যয় ছিল ৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। বিপরীতে কোম্পানিটি ব্যয় করেছে ১৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অর্থাৎ সীমার চেয়ে ৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করেছে। এ ছাড়া প্রাইম ইসলামী লাইফ ৪ কোটি ২৯ লাখ, শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৩ কোটি ৮২ লাখ, বেঙ্গল ইসলামী লাইফ ২ কোটি ৯৪ লাখ এবং রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২ কোটি ১৪ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করেছে। জেনিথ ইসলামী লাইফ ১ কোটি ৮৪ লাখ, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স ১ কোটি ৬৪ লাখ, এনআরবি ইসলামিক লাইফ ১ কোটি ৬৩ লাখ, প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ১ কোটি ৫৪ লাখ, প্রগ্রেসিভ লাইফ ১ কোটি ৫২ লাখ, পদ্মা ইসলামী লাইফ ১ কোটি ৪৬ লাখ, স্বদেশ লাইফ ১ কোটি ৩৪ লাখ এবং যমুনা লাইফ ৯৭ লাখ টাকা অনুমোদিত সীমার বেশি ব্যয় করেছে। চার্টার্ড লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, বায়রা লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, বেস্ট লাইফ, এলআইসি বাংলাদেশ ও হোমল্যান্ড লাইফও অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে। এসব কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যয় ২৯ লাখ থেকে ৮৫ লাখ টাকার মধ্যে। এর মধ্যে বায়রা লাইফের অনুমোদিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা ছিল শূন্য। এরপরও বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়েছে। ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে সীমা অতিক্রমের প্রবণতা শুধু চলতি বছরের নয়। ২০২৫ সালে পুরো জীবন বীমা খাতের জন্য অনুমোদিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা ছিল ৩ হাজার ৮০১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। বিপরীতে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ১৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ অনুমোদিত সীমার চেয়ে ২১৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে। সে হিসাবে, গত বছর পুরো খাতে যে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছিল, তার প্রায় ১২ দশমিক ৬ শতাংশের সমান অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই সীমা অতিক্রম করা কোম্পানিগুলোর। এতে প্রশ্ন উঠেছে, আইডিআরএর নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা আদৌ কতটা কার্যকরভাবে মানানো যাচ্ছে। জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে সীমা অতিক্রমের সমস্যা নতুন নয়। আইডিআরএর এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১৭টি জীবন বীমা কোম্পানি ব্যবস্থাপনা খাতে ১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে সব জীবন বীমা কোম্পানিকে শুনানিতে ডাকে আইডিআরএ। অনুমোদিত সীমার বেশি ব্যয় না করার পাশাপাশি অতীতে করা অতিরিক্ত ব্যয় ধীরে ধীরে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় ২০১৮ সালে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আবার বৈঠক করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তখন অতিরিক্ত ব্যয় করা অর্থ পুনর্ভরণের অঙ্গীকার করে কোম্পানিগুলো। এরপর ২০২১ সালে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হয়। সুপারভাইজরি পর্যায়ে পাঁচটির পরিবর্তে তিনটি গ্রেড নির্ধারণ করে বেতন-ভাতা, কমিশন, বোনাস ও যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়। তবে এসব উদ্যোগের পরও অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবশ্য বলছেন, একটি প্রান্তিকের হিসাব দিয়ে কোনো কোম্পানির পুরো বছরের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের চিত্র মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। কারণ, অনেক কোম্পানির ব্যবসার বড় অংশ বছরের শেষ দিকে হয়। তবে বছরের শুরু থেকেই ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেনিথ ইসলামী লাইফের সিইও এস এম নুরুজ্জামান বলেন, বীমা খাতের ভাবমূর্তি সংকটের কারণে অনেক কোম্পানি নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমার মধ্যে থাকতে পারছে না। কয়েকটি কোম্পানির অনিয়ম ও গ্রাহকদের দাবি সময়মতো পরিশোধ না করার কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ঘোরানো হয়েছে। এতে বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট গভীর হয়েছে। ফলে নতুন পলিসি বিক্রি ও আয় কমেছে। এ পরিস্থিতিতে কিছু ভালো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমার মধ্যে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম বলেন, কোনো একটি প্রান্তিকের হিসাব দিয়ে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। পুরো বছরের হিসাব দেখতে হবে। কারণ, অনেক কোম্পানির ব্যবসার বড় অংশ বছরের শেষ দিকে হয়। তাঁর কোম্পানির প্রায় ৩৫ শতাংশ ব্যবসা নভেম্বর-ডিসেম্বরে হয়। তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনা ব্যয় মূলত ব্যবস্থাপনার বিষয়। অনেক কোম্পানি ব্যবসা সংগ্রহ করতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ করছে। অফিস পরিচালনাসহ বিভিন্ন ব্যয়ের সঙ্গে ব্যবসার পরিমাণের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। ব্যবস্থাপনা চাইলে এসব ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সীমার বেশি ব্যয় করা একটি জীবন বীমা কোম্পানির সিইও বলেন, সুপারভাইজরি পর্যায়ের কমিশন ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম কারণ। কমিশন কমানো বা কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। অবশ্য সব কোম্পানি অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করেনি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ১৪টি কোম্পানি অনুমোদিত সীমার মধ্যে বা তার চেয়ে কম ব্যয় করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যয় করেছে গার্ডিয়ান লাইফ। কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি ১ লাখ টাকা। বিপরীতে অনুমোদিত সীমা ছিল ৬৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ সীমার চেয়ে ১৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা কম ব্যয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আইডিআরএর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এই হিসাব নিশ্চিত হয়েছে। এ ছাড়া ডেল্টা লাইফ ৮ কোটি ৭৭ লাখ এবং মেঘনা লাইফ ৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা অনুমোদিত সীমার চেয়ে কম ব্যয় করেছে। পপুলার লাইফ, ন্যাশনাল লাইফ, প্রগতি লাইফ ও সন্ধানী লাইফও অনুমোদিত সীমার মধ্যে ব্যয় করেছে। গার্ডিয়ান লাইফের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) মো. সজীব হোসেন বলেন, আর্থিক শৃঙ্খলা, প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে তাঁদের ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। নিয়মিত বাজেট পর্যালোচনা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পরিহার ও বিভিন্ন কার্যক্রমের ডিজিটালাইজেশনের ফলে গ্রাহকসেবার মান বজায় রেখেই ব্যয় সাশ্রয় করা গেছে। বীমা কোম্পানির জন্য ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং গ্রাহকের প্রতি প্রতিশ্রুতি পূরণের সামর্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের তথ্য তাই বলছে, ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা ও একাধিক উদ্যোগ থাকলেও তা মানার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২৫ সালে পুরো খাতের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর মাত্র তিন মাসেই ২২টি কোম্পানির ব্যয় সীমা অতিক্রমের ঘটনা সেই প্রশ্নকেই আরও সামনে এনেছে।-সূত্র: কালবেলা News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: