বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন ও দায়ীদের বিচারের দাবি, ‘চিকিৎসায় অবহেলা ও পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তদন্তে সত্য উদঘাটন হোক’ — মাসুদ সাঈদী

প্রকাশিত: ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০২৬

ফারজানা ফারাবী, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও চিকিৎসা-প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম, অবহেলা কিংবা পরিকল্পিত হত্যার ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁর তৃতীয় সন্তান ও সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী।
১৪ আগস্ট ২০২৬ আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুর তিন বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে দেওয়া এক দীর্ঘ স্মৃতিচারণমূলক লেখায় মাসুদ সাঈদী তাঁর বাবার জীবনের শেষ ৩০ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরে এ দাবি জানান।
লেখায় তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট কাশিমপুর কারাগার থেকে আল্লামা সাঈদীকে হাসপাতালে নেওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি তাঁর বাবার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় তিনি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েন। পরে রাতের দিকে আল্লামা সাঈদীকে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতাল, বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নেওয়া হয়।
সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল্লামা সাঈদী ১৩ আগস্ট ২০২৩ রাতে বিএসএমএমইউতে ভর্তি হন এবং পরদিন ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় তাঁর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। পরে রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষও জানিয়েছিল, চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা প্রচলিত চিকিৎসা-প্রটোকল অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে মাসুদ সাঈদীর দাবি, তাঁর বাবার চিকিৎসা-প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল ‘রহস্যজনক ও সন্দেহজনক’। তিনি মনে করেন, আল্লামা সাঈদীকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কি না, চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না এবং তাঁর মৃত্যুর পেছনে পরিকল্পিত কোনো ভূমিকা ছিল কি না—তা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
‘আব্বাকে হাসপাতালে নেওয়ার খবরও আমাকে জানানো হয়নি’
মাসুদ সাঈদী তাঁর লেখায় বলেন, ১৩ আগস্ট ২০২৩ তিনি ঢাকার রামপুরার একটি অফিসে অবস্থান করছিলেন। আসরের নামাজের সময় তাঁর মোবাইলে কাশিমপুর কারাগারের এক রক্ষীর ফোন আসে। ওই ব্যক্তি তাঁকে জানান, আল্লামা সাঈদীকে জরুরি ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, খবরটি পাওয়ার পরপরই কারা কর্তৃপক্ষের সুপার ও জেলারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য পাননি। ফলে তিনি ধারণা করতে থাকেন, তাঁর বাবাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অথবা পিজি হাসপাতালের কোনো একটিতে নেওয়া হতে পারে।
মাসুদ সাঈদীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চলে যান এবং একই সঙ্গে অন্যদের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও পিজি হাসপাতালে খোঁজ নেওয়ার জন্য পাঠান। পরে রাত ১০টার পর নিশ্চিত হন, আল্লামা সাঈদীকে পিজি হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
রাত প্রায় ১১টার দিকে আল্লামা সাঈদীকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স পিজি হাসপাতালের মূল ফটকে পৌঁছায়। মাসুদ সাঈদী দাবি করেন, সেখানে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল।
‘অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমেই আব্বা সবাইকে সালাম দেন’
মাসুদ সাঈদীর বর্ণনায়, অ্যাম্বুলেন্স থেকে দুজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের কাঁধে ভর করে আল্লামা সাঈদী নামেন। তিনি উপস্থিত লোকজনের দিকে হাত নেড়ে বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম’। উপস্থিত মানুষ সমস্বরে তাঁর সালামের জবাব দেন।
মাসুদ সাঈদী বলেন, ওই সময় তাঁর বাবার মুখে হাসি ছিল এবং তিনি কয়েকজনের সঙ্গে কুশল বিনিময়ও করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তাঁকে দেখে মনে হয়নি যে তিনি এতটা সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন।
তবে মাসুদ সাঈদীর অভিযোগ, হাসপাতালে প্রবেশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে বাবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেন এবং আল্লামা সাঈদীর সঙ্গে একান্তে কথা বলার বা তাঁর শারীরিক অবস্থা জানার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন মাসুদ সাঈদীর
মাসুদ সাঈদী তাঁর লেখায় উল্লেখ করেন, চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁর বাবা হার্ট অ্যাটাক নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর প্রশ্ন—হার্ট অ্যাটাকের পরও কেন দ্রুত এনজিওগ্রাম বা প্রয়োজনীয় ইন্টারভেনশন করা হয়নি?
তাঁর দাবি, চিকিৎসক ডা. এস এম মোস্তফা জামান সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক ইসিজিতে হার্ট অ্যাটাকের বিষয়টি ধরা পড়ে এবং প্রথমে প্রাইমারি পিসিআই করার কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বুকে ব্যথা কমে যাওয়ায় তাৎক্ষণিক পিসিআই না করে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে মাসুদ সাঈদীর প্রশ্ন, শুধু বুকে ব্যথা কমে যাওয়াকে পিসিআই না করার কারণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল কি না এবং আল্লামা সাঈদীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক চিকিৎসা-নীতিমালা অনুযায়ী হয়েছিল কি না—তা স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘হার্ট অ্যাটাক’ শনাক্ত হওয়ার পর রোগীর ঝুঁকি, পূর্ববর্তী হৃদরোগ, রিং বসানোর ইতিহাস, ইসিজি, অন্যান্য পরীক্ষা এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আল্লামা সাঈদীর ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ করা উচিত।
‘মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হলো না কেন?’
মাসুদ সাঈদীর অন্যতম প্রধান প্রশ্ন, তাঁর বাবার মতো জটিল ও উচ্চঝুঁকির রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর কেন পরিবারের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বোর্ডের কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে পরিচালনা করা হয়নি।
তাঁর দাবি, হাসপাতালের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন; তবে পরিবারকে চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে যথেষ্টভাবে অবহিত করা হয়নি।
অন্যদিকে, বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের ১৬ আগস্ট ২০২৩-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, আল্লামা সাঈদীর চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা-চর্চা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।
‘শেষবার আব্বার হাত ধরেছিলাম’
মাসুদ সাঈদী লিখেছেন, ইমার্জেন্সি থেকে সিসিইউতে নেওয়ার সময় তিনি কিছুক্ষণের জন্য বাবার হাত ধরতে পেরেছিলেন। আল্লামা সাঈদীও তাঁর হাত শক্ত করে ধরেছিলেন।
পরে সিসিইউতে নেওয়ার আগে তিনি বাবার হাতে চুমু দেন এবং আল্লামা সাঈদী তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। দূর থেকে মাসুদ সাঈদী বাবাকে বলেন, ‘আব্বা, আমরা সবাই আছি এখানে। আমরা আছি আব্বা। আপনাকে মহান আল্লাহর হাতে সোপর্দ করলাম।’
মাসুদ সাঈদীর ভাষ্য, সেটিই ছিল তাঁর বাবার সঙ্গে শেষ দেখা ও শেষ স্পর্শ।
‘সারাদিন হাসপাতালে থেকেও বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি’
মাসুদ সাঈদীর দাবি, ১৪ আগস্ট সকাল থেকে তিনি বারবার চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর বাবার সঙ্গে দেখা করার আবেদন করেন। কিন্তু বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের অনুমতির কথা বলে তাঁকে অপেক্ষায় রাখা হয়।
তিনি বলেন, ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ, হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমানসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন এবং বাবার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ চান।
মাসুদ সাঈদীর দাবি, পরিবারের পক্ষ থেকে আল্লামা সাঈদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং তাঁর সঙ্গে একজন পারিবারিক এটেনডেন্ট রাখার অনুমতি চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও আবেদন করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আবেদনের বিষয়ে তাঁকে তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর অনুমতি দেওয়া হয়নি।
তবে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ পরে এক বিবৃতিতে দাবি করেছিল, রোগীর চিকিৎসা, রোগের গতিপ্রকৃতি ও সম্ভাব্য অবস্থা সম্পর্কে পরিবারকে জানানো হয়েছিল।
‘দ্বিতীয়বার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের খবরও পরিবারকে জানানো হয়নি’
মাসুদ সাঈদীর দাবি, ১৪ আগস্ট সন্ধ্যার পর হাসপাতাল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে আল্লামা সাঈদীর শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের খবরও তিনি জানতে পারেন।
বিএসএমএমইউর বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটের দিকে আল্লামা সাঈদীর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় এবং চিকিৎসকরা লাইফ সাপোর্টসহ প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসা শুরু করেন। পরে রাত আনুমানিক ৮টা ৪০ থেকে ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
মাসুদ সাঈদীর প্রশ্ন, যদি সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপ, সিপিআর, ইনটিউবেশন ও লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার সময়সহ পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল রেকর্ড কেন প্রকাশ করা হবে না?
চিকিৎসা-প্রক্রিয়া নিয়ে সাতটি প্রধান প্রশ্ন
মাসুদ সাঈদী তাঁর লেখায় আল্লামা সাঈদীর চিকিৎসা নিয়ে বেশ কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
১. হার্ট অ্যাটাক শনাক্ত হওয়ার পর আল্লামা সাঈদীর এনজিওগ্রাম করা হয়নি কেন? তাঁর পূর্ববর্তী হৃদরোগ ও রিং বসানোর ইতিহাস বিবেচনায় চিকিৎসকরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তার মেডিকেল কারণ কী ছিল?
২. চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী প্রথমে পিসিআই করার কথা বিবেচনা করা হলেও পরে বুকে ব্যথা না থাকায় তা করা হয়নি—এই সিদ্ধান্তের চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী ছিল?
৩. আল্লামা সাঈদীর মতো উচ্চঝুঁকির রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পূর্ণাঙ্গ মতামত, মেডিকেল রেকর্ড ও চিকিৎসা-নথি কি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে?
৪. হাসপাতালে আনার পর তাঁকে কী কী ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, কোন চিকিৎসক কোন ওষুধ বা চিকিৎসা-পদ্ধতি নির্ধারণ করেছিলেন এবং কখন কোন চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল—এসবের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড কোথায়?
৫. ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট থেকে রাত ৮টা ৪০ মিনিটের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিপিআর, ইনটিউবেশন, লাইফ সাপোর্ট ও অন্যান্য জরুরি চিকিৎসার প্রতিটি ধাপের সময়ভিত্তিক মেডিকেল রেকর্ড কী বলে?
৬. আল্লামা সাঈদীর চিকিৎসায় কোন কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং তাঁদের প্রত্যেকের দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত কী ছিল?
৭. তাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব কাগজপত্র, ইসিজি, ইকো, ল্যাব রিপোর্ট, ওষুধের তালিকা, নার্সিং চার্ট, সিসিইউ রেকর্ড, সিপিআর/কোড রেকর্ড এবং লাইফ সাপোর্টের নথি কি স্বাধীন তদন্তের জন্য সংরক্ষিত আছে?
চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
মাসুদ সাঈদী তাঁর লেখায় ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ, ডা. এস এম মোস্তফা জামান এবং তৎকালীন হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি ডা. এস এম মোস্তফা জামানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলে দাবি করেন, তাঁর বাবার রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত অবস্থানের সঙ্গে চিকিৎসকের পূর্ববর্তী অবস্থানের কোনো সম্পর্ক চিকিৎসা-সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা তদন্ত করা উচিত।
তবে প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, ডা. মোস্তফা জামান আল্লামা সাঈদীর চিকিৎসায় যুক্ত বিশেষজ্ঞ দলের একজন ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর তিনি চিকিৎসা-প্রক্রিয়ায় নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের কথা জানিয়েছিলেন। পরে তাঁকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন।
‘পেট ফুলে যাওয়ার কারণও তদন্ত করা হোক’
মাসুদ সাঈদী তাঁর লেখায় আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুর পরের ছবিতে পেট ফোলা দেখার কথা উল্লেখ করে এর কারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার সময় শ্বাসনালিতে ব্যবহৃত টিউব সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত।
তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত অভিযোগ ও সন্দেহ; এর পক্ষে কোনো স্বাধীন মেডিকেল তদন্তের ফল বা প্রামাণ্য চিকিৎসা-রেকর্ড প্রকাশ্যে রয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য স্বাধীন বিশেষজ্ঞ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
‘মৃত্যুর কারণ নিয়ে স্বাধীন তদন্ত হয়নি’
মাসুদ সাঈদীর অভিযোগ, তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় অবহেলা ও মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা হয়নি।
অন্যদিকে, বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ ১৬ আগস্ট ২০২৩-এর বিবৃতিতে দাবি করেছিল, আল্লামা সাঈদীর চিকিৎসায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফলে আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের অভিযোগ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য—দুই পক্ষের দাবির সত্যতা যাচাই করতে একটি স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন মাসুদ সাঈদী।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির দাবি
মাসুদ সাঈদী বলেন, তাঁর বাবার মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো তিন বছর ধরে উত্তরহীন রয়েছে, সেগুলোর জবাব রাজনৈতিক বক্তব্য বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নয়; বরং স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা উচিত।
তিনি বলেন, ‘আল্লামা সাঈদী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাভাবিক চিকিৎসাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন, নাকি চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা, অনিয়ম বা পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী—তা তদন্তেই প্রমাণিত হতে হবে।’
এ জন্য তিনি সরকারের কাছে অবিলম্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন, আল্লামা সাঈদীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব নথি সংরক্ষণ ও পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রয়োজন হলে স্বাধীন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণের দাবি জানান।
তাঁর দাবি, তদন্তে যদি কোনো চিকিৎসক, কর্মকর্তা বা অন্য কারও বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত আইনে তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাসুদ সাঈদীর ভাষায়, ‘আমরা কাউকে আগেই অপরাধী সাব্যস্ত করতে চাই না। আমরা সত্য জানতে চাই। আমার আব্বার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জাতির সামনে পরিষ্কার হওয়া উচিত। তিনি যদি স্বাভাবিক চিকিৎসাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করে থাকেন, তদন্তে সেটিও প্রমাণিত হোক। আর যদি চিকিৎসায় অবহেলা, অনিয়ম কিংবা পরিকল্পিত হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক।’
তিনি বলেন, ‘আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে অনতিবিলম্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য জাতির সামনে তুলে ধরা হোক।’

তথ্য সূত্রঃ মাসুদ সাঈদী ( এমপি)