বিজিআইসির বার্ষিক প্রতিবেদনে অন্য কোম্পানির নাম, ৪৫ কোটির পাওনায় অডিট আপত্তি প্রকাশিত: ৮:৫৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০২৬ নিজস্ব প্রতিনিধি : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির (বিজিআইসি) ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের একটি অংশে বিজিআইসির বদলে অন্য একটি বীমা কোম্পানির নাম ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় ৪৫ কোটি টাকা পাওনা দেখানো হলেও এর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাননি নিরীক্ষকেরা। আবার একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের নিট মুনাফার দুটি ভিন্ন অঙ্ক দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বীমা বিধিমালায় নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৭ কোটি টাকার বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে কোম্পানিটি। কোম্পানিটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বার্ষিক প্রতিবেদনে অন্য কোম্পানির নাম বিজিআইসির বার্ষিক প্রতিবেদনের ২৮৯ নম্বর পৃষ্ঠার ১৭ নম্বর পয়েন্টে সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়ে একটি বক্তব্য রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘দ্য করপোরেট গভর্ন্যান্স প্র্যাকটিসেস অব সিটি ইন্স্যুরেন্স এনশিওর দ্য রাইটস অব…’। অথচ প্রতিবেদনটি বিজিআইসির। অর্থাৎ, সিটি ইন্স্যুরেন্সের নাম পরিবর্তন না করেই ওই বক্তব্য বিজিআইসির বার্ষিক প্রতিবেদনে চলে এসেছে। তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে এ ধরনের ভুল আর্থিক তথ্য প্রকাশের মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তবে বিজিআইসির কোম্পানি সেক্রেটারি সাইফুদ্দিন আহমেদ বাণিজ্য বার্তাকে বলেন, এটি কপি-পেস্টের ঘটনা নয়। ভুল করে অন্য একটি কোম্পানির নাম চলে এসেছে। আইনি সীমার চেয়ে ৭ কোটি টাকা বেশি ব্যয় বিজিআইসির ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন নিরীক্ষকেরা। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ৩১৮ নম্বর পৃষ্ঠার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ আইনি সীমা ছিল ২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৭ কোটি ৭ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করেছে কোম্পানিটি। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বিজিআইসির কোম্পানি সেক্রেটারি সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, কর্মীদের বেতন-ভাতা বাড়ার কারণে ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়েছে। বিজিআইসি পুরোনো প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অনেক কর্মী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। সময়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, ফলে তাদের বেতনও বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় কোম্পানির ব্যবসা ও আয় বাড়েনি। সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, কর্মীদের তো বাদ দেওয়া যায় না। কর্মসংস্থান কমানোও কাম্য নয়। তাই আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আয় বাড়ানো। আয় বাড়লে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের অনুপাতও ধীরে ধীরে কমে আসবে। ৪৫ কোটি টাকার পাওনার প্রমাণ মেলেনি কোম্পানির আর্থিক স্থিতিপত্রে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা হিসেবে ৪৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। এর বাইরে অন্য একটি খাতে আরও ৬৬ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। সব মিলিয়ে পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ কোটি ১১ লাখ টাকা। তবে এসব পাওনার পক্ষে তৃতীয় পক্ষের নিশ্চয়তা বা পর্যাপ্ত প্রমাণ পাননি নিরীক্ষকেরা। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ৩১৮ নম্বর পৃষ্ঠায় এ বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। ফলে এসব পাওনার অস্তিত্ব ও আদায়যোগ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, অডিটের সময় পাওনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেক পক্ষ চিঠির জবাব না দেওয়ায় নিরীক্ষকেরা পাওনার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। পরে এসব পাওনার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। নিট মুনাফার দুই অঙ্ক বিজিআইসির ২০২৫ সালের নিট মুনাফা নিয়েও দুই ধরনের অঙ্ক রয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদনের ১৮ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘একনজরে আর্থিক ফলাফল’ অংশে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ৬ কোটি ২১ লাখ টাকা। অন্যদিকে একই প্রতিবেদনের ৩২৪ নম্বর পৃষ্ঠায় নিরীক্ষিত লাভ-ক্ষতির হিসাবে নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, একই বছরের নিট মুনাফার দুই অঙ্কের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ২ কোটি টাকা। একটি কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে একই আর্থিক সূচকের ভিন্ন অঙ্ক বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভ্রান্তির কারণ হতে পারেন বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে কোম্পানি সেক্রেটারি সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রকৃত মুনাফা জানতে প্রফিট অ্যান্ড লস স্টেটমেন্ট ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক হিসাব মিলিয়ে দেখতে হবে। আর্থিক সংকটে থাকা দুই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ৩১৮ ও ৩১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় বিজিআইসির বিনিয়োগ নিয়েও কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নিরীক্ষকেরা জানিয়েছেন, আর্থিক সংকটে থাকা আভিভা ফাইন্যান্স ও পদ্মা ব্যাংকে কোম্পানিটির মোট ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এসব বিনিয়োগ থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ঝুঁকি থাকলেও কোম্পানি কোনো সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখেনি। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন না করার বিষয়টিও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির গ্র্যাচুইটি ফান্ড জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) স্বীকৃত নয় বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষকেরা। ডব্লিউপিপিএফের বিষয়ে সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে এই তহবিল প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ), বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছ থেকে বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ডব্লিউপিপিএফ প্রযোজ্য নয়—এমন মতামত পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ায় কোম্পানি সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছে। অডিট কমিটির সভাতেও ব্যত্যয় বিজিআইসির করপোরেট গভর্ন্যান্স নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কোম্পানিটির নিজস্ব বার্ষিক প্রতিবেদন। প্রতিবেদনের ২৭৭ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ৬০তম অডিট কমিটির সভায় কোনো স্বতন্ত্র পরিচালক উপস্থিত ছিলেন না। করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুযায়ী, অডিট কমিটির সভায় স্বতন্ত্র পরিচালকের উপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া ৬২তম সভায় অডিট কমিটির সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) উপস্থিত ছিলেন এবং তার উপস্থিতিতে কোরাম পূর্ণ হয়। বিজিআইসি ১৯৮৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ার ‘এ’ শ্রেণিতে লেনদেন হচ্ছে। কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩৩ দশমিক ৪০ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৪৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ার। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিজিআইসির শেয়ার সর্বশেষ ৪৩ টাকা দরে লেনদেন হয়েছে। News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: