১৯৭১ সালের বিতর্কিত দলিল ঘিরে জমির মালিকানা বিরোধ: হিন্দু পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ আলহাজ্ব গ্রুপের আব্দুল আলী গংয়ের বিরুদ্ধে

প্রকাশিত: ৮:৪৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬

অনুসন্ধানী প্রতিবেদকঃ রাজধানীর নন্দীপাড়া মৌজার সিএস দাগ নম্বর ৭৬৯-এর ৪১ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে জটিল আকার ধারণ করেছে।

ভুক্তভোগী রাম আনন্দ মন্ডলের অভিযোগ, ১৯৬০ সালের বৈধ ক্রয়দলিল ও পরবর্তী ওয়ারিশসূত্রে মালিকানা এবং দখলের দাবি থাকা সত্ত্বেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সম্পাদিত একটি দলিলের ভিত্তিতে আলহাজ্ব গ্রুপের মালিক আব্দুল আলী গং ওই জমির ওপর মালিকানা দাবি করছেন।

ভুক্তভোগী পক্ষের নথিপত্র ও বক্তব্য অনুযায়ী, আরএস রেকর্ডীয় মালিক নীরদ বালা দাস ১৯৬০ সালের ১৮ জুলাই ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে ৪১ শতাংশ জমি শ্রী রূপচাঁদ মন্ডল ও গোপিচাঁদ মন্ডলের কাছে বিক্রি করেন। পরবর্তীতে রূপচাঁদ মন্ডল ১৯৬৭ সালে মৃত্যুবরণ করলে তার পুত্র রাম আনন্দ মন্ডল ওয়ারিশসূত্রে জমির মালিকানা লাভ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।

ইস্টার্ন হাউজিংয়ের নামজারি নিয়ে বিরোধ
রাম আনন্দ মন্ডল নামজারির উদ্যোগ নিলে জানতে পারেন, সংশ্লিষ্ট জমি ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের নামে নামজারি করা হয়েছে। এরপর তিনি ২৪/২৫ মিস কেসের মাধ্যমে ওই নামজারি চ্যালেঞ্জ করেন।

ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের নামজারি কর্তন করে রাম আনন্দ মন্ডলের নামে ১২৬৯১ (IX-I), ২০২৫-২০২৬ নম্বর নামজারি গত ২৯ এপ্রিল ২০২৬ সম্পন্ন হয়।

১৯৭১ সালের ৭৬৮১ নম্বর দলিল নিয়ে প্রশ্ন
বিরোধের নতুন মাত্রা তৈরি হয় ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখের ৭৬৮১ নম্বর দলিলকে কেন্দ্র করে। ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, আলহাজ্ব গ্রুপের আব্দুল আলী গং ওই দলিলের ভিত্তিতে একই জমির মালিকানা দাবি করছেন।

রাম আনন্দ মন্ডলের পক্ষের প্রশ্ন—১৯৬০ সালের ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে রূপচাঁদ মন্ডল ও গোপিচাঁদ মন্ডল জমি ক্রয় করে থাকলে তাদের ভাই লেবুচান মন্ডলের ওই জমি বিক্রির আইনগত অধিকার কীভাবে সৃষ্টি হলো?

ভুক্তভোগী পক্ষের আরও দাবি, স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি ও তৎকালীন সময়ের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী লেবুচান মন্ডল ওই জমি বিক্রি করেননি এবং কারও সঙ্গে বায়নাপত্রও করেননি। তবে এসব দাবির সত্যতা নির্ধারণে মূল দলিল, রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি নথি যাচাই করা জরুরি।

President’s Order No. 12 of 1972-এর প্রভাব কী?
ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, ১৯৭১-৭২ সময়কালে সম্পাদিত নির্দিষ্ট কিছু দলিলের আইনগত কার্যকারিতা পরবর্তী সময়ে President’s Order No. 12 of 1972-এর আলোকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

তবে ৭৬৮১ নম্বর দলিলটি ওই আদেশের আওতাভুক্ত কি না, হলে তার সুনির্দিষ্ট আইনগত প্রভাব কী—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আদালতের নথি পর্যালোচনা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ফলে বিষয়টি আইনগত ব্যাখ্যা ও প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

মিস আপিল ও রিভিশন মামলা নিয়ে অভিযোগ
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব), ঢাকার মিস আপিল নং ৪৩৮/২০২৪ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ভুক্তভোগী পক্ষ। তাদের দাবি, মামলার শুনানির তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নির্ধারিত থাকার কথা থাকলেও তার আগে ১৭ আগস্ট ২০২৬ একটি আদেশ দেওয়া হয়।

তাদের আরও অভিযোগ, প্রকৃত দাবিদার রাম আনন্দ মন্ডলকে যথাযথভাবে পক্ষভুক্ত না করেই প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তার নামে সম্পন্ন নামজারি বাতিলের জন্য ভূমি অফিস ও ডেমরা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে রাম আনন্দ মন্ডল ভূমি আপিল বোর্ড, ঢাকায় রিভিশন মামলা নং ৩-২১১/২০২৬ দায়ের করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

বিচারাধীন অবস্থায় নামজারি বাতিলের তৎপরতার অভিযোগ
রাম আনন্দ মন্ডলের অভিযোগ, আপিল ও রিভিশন প্রক্রিয়া চলমান থাকা সত্ত্বেও তার নামে সম্পন্ন নামজারি বাতিলের জন্য বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের মাধ্যমে ডেমরা সার্কেলের এসিল্যান্ডকে চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

রাজেশ-তপনের দাবিও যাচাইয়ের দাবি
বিরোধের আরেকটি অংশে রাজেশ দাশ ও তপন কুমার দাস নিজেদের নীরদ বরন দাসের পুত্র হিসেবে পরিচয় দিয়ে জমিটির ওপর মালিকানা দাবি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগী পক্ষের প্রশ্ন, নীরদ বরন দাস যদি ১৯৬০ সালের ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে জমি রূপচাঁদ ও গোপিচাঁদ মন্ডলের কাছে বিক্রি করে থাকেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে তার উত্তরাধিকারীরা একই জমির ওপর কীভাবে মালিকানা দাবি করছেন?

এ প্রশ্নের উত্তর পেতে বিক্রয়দলিল, খতিয়ান, নামজারি, উত্তরাধিকার সনদসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

দখল ও ভয়ভীতির অভিযোগ
রাম আনন্দ মন্ডল অভিযোগ করেছেন, আব্দুল আলী গংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রফিকুল ইসলাম, মুরাদ গংসহ কয়েকজন তার জমি দখল এবং নামজারি বাতিলের জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন; তাকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য জানা এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

নথিই নির্ধারণ করবে প্রকৃত মালিকানা
নন্দীপাড়া মৌজার এই জমির বিরোধে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—১৯৬০ সালের ৯২৯২ নম্বর দলিল, ১৯৭১ সালের ৭৬৮১ নম্বর দলিল, সংশ্লিষ্ট খতিয়ান ও নামজারি রেকর্ড, ২৪/২৫ মিস কেস, মিস আপিল নং ৪৩৮/২০২৪ এবং রিভিশন মামলা নং ৩-২১১/২০২৬—সব নথি একসঙ্গে পর্যালোচনা করা।

প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে কোনো পক্ষের প্রভাব, অর্থবল কিংবা ভয়ভীতি নয়; বরং নিবন্ধিত দলিল, সরকারি রেকর্ড, উত্তরাধিকারসূত্র, দখলের বৈধতা এবং আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনসম্মত সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ভিত্তি হওয়া উচিত।

বিশেষ করে বিরোধটি বিচারাধীন থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আদালত ও উচ্চতর কর্তৃপক্ষের আদেশের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া। একই সঙ্গে কোনো পক্ষ যাতে প্রভাব খাটিয়ে জমির দখল পরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী রাম আনন্দ মন্ডল।