সোনালী ব্যাংকের নিরাপত্তায় জিএম আব্দুল কুদ্দুসের অযোগ্যতার অভিযোগ: বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ, বিএনপির ব্যানার অপসারণে বিতর্ক প্রকাশিত: ৩:৩২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ বিশেষ প্রতিবেদনঃ রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা; নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে প্রশাসনের জরুরি তদন্ত দাবি,মতিঝিল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনঃ ঢাকা সোনালী ব্যাংক পিএলসির প্রধান কার্যালয়ের নিরাপত্তা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. আব্দুল কুদ্দুসকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার অপসারণের ঘটনা, তার অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এবং ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বহিরাগতদের অবাধ চলাচল—সব মিলিয়ে নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বে তার সক্ষমতা ও উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার প্রধান কাজ হলো ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী, গ্রাহক, স্থাপনা, নগদ অর্থ, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রধান কার্যালয়ের বাস্তব চিত্র যদি অভিযোগ অনুযায়ী হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—দায়িত্বপ্রাপ্ত জিএম কি তার দায়িত্ব পালনে কার্যকরভাবে সক্ষম হচ্ছেন? ব্যানার অপসারণে পরস্পরবিরোধী প্রশ্ন গত ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিভিন্ন ব্যানার টাঙানো হয়। পরদিন ২ সেপ্টেম্বর এসব ব্যানার অপসারণের ঘটনায় ব্যাংকের ভেতরে আলোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, নিরাপত্তা বিভাগের অধীন কর্মীদের ব্যবহার করে ব্যানারগুলো সরানো হয়েছে এবং এতে জিএম আব্দুল কুদ্দুসের ভূমিকা ছিল। তবে আব্দুল কুদ্দুসের বক্তব্য, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ব্যানার অপসারণের ঘটনা নয়; ব্যাংকের সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানার সরানো হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই এসব ব্যানার অপসারণ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন—সেই নির্দেশের লিখিত নথি কোথায়? কোন কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিয়েছেন? নিরাপত্তা বিভাগের কর্মীদের ব্যানার অপসারণে ব্যবহারের অনুমোদন কে দিয়েছেন? এসবের সুস্পষ্ট উত্তর না মেলায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন ব্যাংকসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে আব্দুল কুদ্দুস বিভিন্ন আওয়ামীপন্থী কর্মসূচি ও সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, বিভিন্ন জাতীয় ও রাজনৈতিক দিবসে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ ও বক্তব্য দেওয়া এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে ফুল দেওয়ার মতো কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিও থাকার দাবি করেছেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হয়েছেন। বর্তমানে জিএম পদে দায়িত্ব পালনরত এই কর্মকর্তার ভবিষ্যতে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়েও ব্যাংকের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে তাকে রাজনৈতিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। বরং তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ছবি, ভিডিও, পদোন্নতির নথি এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক রেকর্ড যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বে থেকেও বহিরাগতদের অবাধ চলাচল? সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ এসেছে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, ব্যাংকের চারপাশে কাপড়ের দোকান, চায়ের স্টল, মুচির দোকান ও বিভিন্ন খাবারের ব্যবসা গড়ে ওঠায় নিয়মিত বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, খাবার বা পণ্য সরবরাহের নামে অনেক বহিরাগত ব্যাংকের বিভিন্ন তলা পর্যন্ত প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। অথচ সাধারণ দর্শনার্থীদের পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কড়াকড়ি রয়েছে। এতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে ব্যাংকের স্পর্শকাতর এলাকাগুলো নিয়ে। ক্যাশ ভোল্ট, আইটি বিভাগ ও সুইফট কার্যালয়ের আশপাশে বহিরাগতদের প্রবেশ কতটা নিয়ন্ত্রিত—তা জরুরি ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ একজন অননুমোদিত ব্যক্তি যদি পরিচয় যাচাই বা নির্দিষ্ট প্রবেশ অনুমতি ছাড়াই ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পৌঁছাতে পারেন, তাহলে তা শুধু শারীরিক নিরাপত্তা নয়, তথ্য ও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থের বিনিময়ে প্রবেশের অভিযোগ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী আরও অভিযোগ করেছেন, কিছু হকার অর্থের বিনিময়ে নিয়মিত ব্যাংকে প্রবেশের সুযোগ পান। অভিযোগটি গুরুতর হলেও এর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি যাচাই করা কঠিন নয়। নিরাপত্তা গেটের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রবেশ রেজিস্টার, ভিজিটর তালিকা, নিরাপত্তাকর্মীদের ডিউটি রোস্টার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করলেই অভিযোগের সত্যতা অনেকটা স্পষ্ট হতে পারে। দায়িত্ব পালনে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন একদিকে ব্যানার অপসারণের মতো প্রশাসনিক ঘটনায় বিতর্ক, অন্যদিকে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ এবং একই সঙ্গে ব্যাংকের ভেতরে বহিরাগতদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার অভিযোগ—এই তিনটি বিষয় একত্রে নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বে থাকা জিএম আব্দুল কুদ্দুসের কার্যকরতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের প্রশ্ন, নিরাপত্তা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি ধারাবাহিকভাবে এত অভিযোগ ওঠে, তাহলে অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও উপযুক্ততা কি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নতুন করে মূল্যায়ন করবে না? প্রশাসনের জরুরি তদন্ত দাবি ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের দাবি, বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্ন হিসেবে না দেখে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাগত দৃষ্টিকোণ থেকে তদন্ত করা উচিত। বিশেষ করে তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন— ১. ব্যানার অপসারণের লিখিত নির্দেশ আদৌ ছিল কি না; ২. নির্দেশটি কোন কর্তৃপক্ষ দিয়েছিলেন; ৩. নিরাপত্তাকর্মীদের দিয়ে ব্যানার অপসারণের অনুমোদন কে দিয়েছিলেন; ৪. ব্যাংকের ভেতরে বহিরাগতদের প্রবেশ ও চলাচল কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়; ৫. ক্যাশ ভোল্ট, আইটি ও সুইফট এলাকার প্রবেশ নিরাপত্তা কতটা কার্যকর; ৬. অর্থের বিনিময়ে হকারদের প্রবেশের অভিযোগ সত্য কি না; ৭. আব্দুল কুদ্দুসের অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না; ৮. তার বর্তমান দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও পেশাগত উপযুক্ততা। সোনালী ব্যাংক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সক্ষমতা বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে হতে হবে দক্ষ, নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বসম্পন্ন। তাই আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের। কিন্তু অভিযোগগুলো উপেক্ষা করে তাকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা দায়িত্বে বহাল রাখা বা ভবিষ্যতে আরও উচ্চপদে বিবেচনা করার আগে তার দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, অতীত কর্মকাণ্ড এবং বর্তমান ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। প্রশ্ন তাই একটাই—সোনালী ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে এত প্রশ্ন, তখন প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি নীরব থাকবে, নাকি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করবে? এদিকে সোনালী ব্যাংকের বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার অপসারণের ঘটনায় গত ৯ সেপ্টেম্বর মো. মিলন মিয়া নামে এক কর্মকর্তা মতিঝিল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে সোনালী ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আব্দুল কুদ্দুস, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শওকত আলী, ডিএমডি মোহাম্মদ শাহরিয়ার, আল আমিন শেখ বাবুল, শামসুদ্দিন, বশির উদ্দিন ও মো. হাকিমসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধান কার্যালয়ে টাঙানো ব্যানার-ফেস্টুন নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই অপসারণ ও ছিঁড়ে ফেলা হয়। এ ঘটনায় কার নির্দেশে, কী উদ্দেশ্যে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ব্যানার অপসারণ করা হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটনের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগে প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণের অনুরোধও করা হয়েছে। অভিযোগকারী বলেছেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। News PhotoCard SHARES অর্থনীতি বিষয়: