ডিবিসির প্রতিবেদন প্রসঙ্গে যমুনা লাইফের সিইও সিসি অজিত চন্দ্র আইচের একান্ত সাক্ষাৎকার

প্রকাশিত: ২:২৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০২৬

নুসরাত বিনতে শহিদ, স্টাফ রিপোর্টারঃ  ডিবিসি নিউজ টেলিভিশনে সম্প্রতি যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অজিত চন্দ্র আইচকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়

সাক্ষাৎকারে তাঁর অতীত কর্মজীবন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালীন উত্থাপিত অভিযোগ এবং যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বর্তমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মোট পাঁচটি প্রশ্ন করা হয়। প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রদর্শন করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেন।

সোনালী লাইফে সিইও থাকাকালীন ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

 প্রশ্ন: ডিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আপনি সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও থাকাকালে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

অজিত চন্দ্র আইচ: কয়েকদিন আগে ডিবিসি অনলাইনের একজন সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান আমার কার্যালয়ে আসেন। চেম্বারে প্রবেশ করেই ক্যামেরা চালু রেখে ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারির একটি চেকে থাকা আমার স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন করেন। অথচ আমি ৩০ জুন ২০২০ তারিখেই সোনালী লাইফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছি। সাংবাদিকের কাছে এ বিষয়ে কোনো লিখিত নথি বা প্রমাণ ছিল না। আমি বারবার ক্যামেরা বন্ধ রেখে আলোচনা করার অনুরোধ করলেও তা মানা হয়নি। আমার কাছে বিষয়টি পরিকল্পিত বলেই মনে হয়েছে।

 আমি ১৫ জুলাই ২০১৩ থেকে ৩০ জুন ২০২০ পর্যন্ত সাত বছর সোনালী লাইফের প্রতিষ্ঠাতা সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার সময়েই কোম্পানিটি চতুর্থ প্রজন্মের প্রথম জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির (আইপিও) পথে এগিয়ে যায় এবং গ্রাহকদের জন্য আকর্ষণীয় বোনাস ও ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা হয়।

 আমি ১ জুলাই ২০২০ তারিখে আইডিআরএর অনুমোদনক্রমে প্রগ্রেসিভ লাইফে যোগদান করি। অথচ আমার চাকরি ছাড়ার প্রায় দেড় বছর পর, ২৭ জানুয়ারি ২০২২ তারিখের একটি চেকে আমার স্বাক্ষর ব্যবহার করে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ড্রাগন সলিউশন টেকনোলজি অ্যান্ড কমিউনিকেশন লিমিটেডের অনুকূলে পে-অর্ডার ইস্যুর বিষয়টি সামনে আসে।

 যমুনা লাইফে সিইও হিসেবে অনুমোদনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি যাচাইয়ের সময় বিষয়টি আইডিআরএর নজরে আসে। পরে সোনালী লাইফ কর্তৃপক্ষ এবং আমিও পৃথকভাবে আইডিআরএকে লিখিত ব্যাখ্যা দিই। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমাকে জানানো হয়নি।

প্রগ্রেসিভ লাইফে ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

 প্রশ্ন: প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সে কর্মরত অবস্থায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

অজিত চন্দ্র আইচ: আমি ১ জুলাই ২০২০ থেকে ৩০ জুন ২০২৩ পর্যন্ত তিন বছর প্রগ্রেসিভ লাইফের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার নিয়োগপত্রে উৎসব বোনাসের বিষয়টি উল্লেখ না থাকলেও পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনে আমাকে বছরে দুটি করে মোট চারটি উৎসব বোনাস দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে আইডিআরএ জানায়, চুক্তিপত্রে বিষয়টি উল্লেখ না থাকায় ওই অর্থ গ্রহণ করা যাবে না। আমি আইডিআরএর নির্দেশনা মেনে প্রতি মাসে বেতন থেকে এক লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। এর লিখিত প্রমাণও আমার কাছে রয়েছে। তাই এ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

 সন্ধানী লাইফে অনিয়মের অভিযোগ

প্রশ্ন: সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কী বলবেন?

অজিত চন্দ্র আইচ: আমি ২০ মে ১৯৯৩ থেকে ৩০ মে ২০১৩ পর্যন্ত টানা ২০ বছর সন্ধানী লাইফে দায়িত্ব পালন করেছি। ভাইস প্রেসিডেন্ট (উন্নয়ন) হিসেবে যোগ দিয়ে পরে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে উন্নীত হই। এই দীর্ঘ সময়ে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ওঠেনি। বরং পরিচালনা পর্ষদের আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র নিয়েই আমি ২০১৩ সালে সোনালী লাইফে প্রতিষ্ঠাতা সিইও হিসেবে যোগদান করি। এখন যে অভিযোগগুলো প্রচার করা হচ্ছে, সেগুলো একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা।

যমুনা লাইফের বর্তমান অবস্থা ও গৃহীত পদক্ষেপ

 প্রশ্ন: যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

অজিত চন্দ্র আইচ: ১ নভেম্বর ২০২৫ সালে পরিচালনা পর্ষদ প্রায় ২৫ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে আমাকে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে নিয়োগ দেয়। পরে ৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পূর্ণাঙ্গ সিইও হিসেবে আইডিআরএর অনুমোদনের জন্য আবেদন পাঠানো হয়।

ইতোমধ্যে আমরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল দিয়ে আধুনিক কাস্টমার কেয়ার ও কল সেন্টার চালু করেছি। পলিসিধারী ও উন্নয়নকর্মী- কর্মকর্তাদের জন্য ডিজিটাল অ্যাপ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে আধুনিক ইআরপি (ERP) সফটওয়্যার চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষিত তরুণদের নিয়োগ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হচ্ছে। কর্মী ও কর্মকর্তাদের সব ধরনের অর্থ ইএফটিএনের মাধ্যমে পরিশোধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো, দুর্বল শাখা পুনর্গঠন, এসওপি বাস্তবায়ন এবং গ্রাহকদের ম্যাচিউরিটি ও মৃত্যু দাবি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কাজে পরিচালনা পর্ষদের পূর্ণ সহযোগিতা পাচ্ছি।

যমুনা লাইফ কবে তালিকাভুক্ত হতে পারে?

প্রশ্ন: যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে?

অজিত চন্দ্র আইচ: আমরা স্বচ্ছতা বজায় রেখে কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা করছি। ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে সিস্টেম উন্নয়ন ও লাইফ ফান্ড আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৮ সালের শুরুতে যমুনা লাইফকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। এতে গ্রাহকদের জন্য বোনাস ও ডিভিডেন্ড প্রদানের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে।

‘পরিকল্পিত অপপ্রচার চলছে’

সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে অজিত চন্দ্র আইচ বলেন, দীর্ঘ ৩৯ বছরের কর্মজীবনে তিনি সততা ও সুনামের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকেই পরিচালনা পর্ষদের আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র নিয়ে বিদায় নিয়েছেন।

তাঁর অভিযোগ, যমুনা লাইফের অগ্রগতি দেখতে না চাওয়া একটি কুচক্রী মহল তাঁর আইডিআরএ অনুমোদন বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত সংবাদও সেই অপপ্রচারেরই অংশ বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, এসব প্রচারণার মাধ্যমে আইডিআরএকে প্রভাবিত করে বিশেষ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান ফৌজিয়া তামান্না এবং বর্তমান সিইওর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের মৌখিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে লিখিত প্রতিক্রিয়ায় জানানো হয়, চেক-সংক্রান্ত জটিলতার ঘটনায় তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদ বিন আমান সংশ্লিষ্ট এবং বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেন, অজিত চন্দ্র আইচ সোনালী লাইফে সাত বছর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি আইডিআরএ’র ওয়েবসাইডে সিইও প্যানেলে তার নাম আইডিআরএ

কতৃপক্ষ ইতিপূর্বেই অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন, যাহাতার সততা ও যোগ্যতার গুরত্বপূর্ন স্বীকৃতিও বহন করে।

এ বিষয়ে আইডিআরএর লাইফ মেম্বার আপেল মাহমুদের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সোনালী লাইফের চেক-সংক্রান্ত বিষয়টি আইডিআরএর নজরে রয়েছে। এ কারণে নিয়োগ অনুমোদনে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। আইডিআরএ সোনালী লাইফ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে তার জবাব দিয়েছে। বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সাক্ষাৎকার চলাকালে অজিত চন্দ্র আইচ প্রতিবেদকের কাছে সন্ধানী লাইফ, সোনালী লাইফ ও প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক প্রদত্ত ছাড়পত্রের কপি প্রদর্শন করেন। যাহা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্বপালন ও সকল ধরনের হিসাব নিকাশ সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেয়া সাপেক্ষেই প্রদান করে থাকেন কোম্পানিগুলো। এছাড়া ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে সোনালী লাইফ কর্তৃক আইডিআরএর কাছে পাঠানো লিখিত ব্যাখ্যার অনুলিপি এবং প্রগ্রেসিভ লাইফে উৎসব বোনাস বাবদ ১০ লাখ টাকা বেতন থেকে পরিশোধের লিখিত প্রমাণও দেখান।

 বীমা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বিষয় দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বিষয়গুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া বীমা খাতের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।