ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিং বাতিল, চালু হলো ঝুঁকিভিত্তিক মূল্যায়ন

প্রকাশিত: ৩:৩৪ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য ও সক্ষমতা মূল্যায়নের দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতি ‘ক্যামেলস (CAMELS) রেটিং’ বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরিবর্তে ব্যাংকগুলোর সার্বিক ঝুঁকি ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা যাচাই করতে ‘কম্পোজিট রিস্ক রেটিং’ (সিআরআর) ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘রিস্ক বেসড সুপারভিশন’ (আরবিএস) বা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামোর একটি অংশ। মূলত ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ভবিষ্যৎমুখী করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এতদিন ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণগত মান, ব্যবস্থাপনা, আয়, তারল্য এবং বাজার ঝুঁকির সংবেদনশীলতা—এই ছয়টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ক্যামেলস রেটিং করা হতো। এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত স্কোরের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে মূল্যায়ন করা হতো, যেখানে ‘এক’ মানে সবচেয়ে ভালো এবং ‘পাঁচ’ ছিল সবচেয়ে দুর্বল। এই রেটিং অত্যন্ত গোপনীয় ছিল এবং কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এমডিকে জানানো হতো।

তবে কর্মকর্তাদের মতে, ক্যামেলস পদ্ধতির বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এটি মূলত ‘ব্যাকওয়ার্ড লুকিং’ বা অতীতনির্ভর। অর্থাৎ ব্যাংক গত কয়েক মাসে কেমন ব্যবসা করেছে বা তাদের আর্থিক প্রতিবেদনের অবস্থা কী ছিল, তার ভিত্তিতেই রেটিং দেওয়া হতো। ফলে ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে থাকলেও তা আগেভাগে এই রেটিংয়ে ধরা পড়ত না।

এর বিপরীতে নতুন চালু হওয়া সিআরআর হবে ‘ফরওয়ার্ড লুকিং’ বা ভবিষ্যৎমুখী। এটি শুধু বর্তমান নয়, বরং ভবিষ্যতে ব্যাংকটি কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং তা মোকাবিলায় ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বা প্রস্তুতি আছে কি না, সেটিও আগাম মূল্যায়ন করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়েছে, ক্যামেলস ও অন্যান্য সমান্তরাল রেটিং ব্যবস্থা চালু থাকলে কাজের পুনরাবৃত্তি হয় এবং তদারকি কর্মকর্তাদের সময় নষ্ট হয়। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দুই পদ্ধতির ফলাফলে অমিল দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সমন্বিত করতে ক্যামেলস বাতিল করা হয়েছে।

নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্গঠনও করা হয়েছে। তদারকি ও অভিযোগ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করে ১৭টি নতুন ‘ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ’ গঠন করা হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোও ইতোমধ্যে ক্যামেলসের পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী ঝুঁকিভিত্তিক রেটিং ব্যবস্থা চালু করেছে।

নতুন এই কাঠামোকে দূরদর্শী মনে করা হলেও ব্যাংকিং বিশ্লেষকরা এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, কাঠামোর পরিবর্তনের চেয়ে বড় প্রয়োজন হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগের সদিচ্ছা।

অভিযোগ রয়েছে, অতীতে অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণ লুকিয়ে বা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) না রেখেও কৃত্রিমভাবে ক্যামেলস রেটিংয়ে ভালো ফলাফল দেখাত। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব কারসাজির বিষয়ে জেনেও অনেক সময় চুপ থাকত কিংবা নীতিগত ছাড় দিয়ে আসত। নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ বা অনিয়মের জন্য বড় ধরনের জরিমানা না করার ফলে তদারকি ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত আর্থিক সংকটের চিত্র আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা মোট বিতরিত ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সিআরআর ব্যবস্থা যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তবে এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিগন্যাল’ হিসেবে কাজ করবে। ফলে ব্যাংকগুলো বড় সংকটে পড়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।