সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের নিরীক্ষায় ৯ কোটি ৭ লাখ টাকার আর্থিক অসঙ্গতি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশিত: ৬:০২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি: স্বাধীন নিরীক্ষকদের (ইন্ডিপেনডেন্ট অডিটরস) পর্যালোচনায় সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণীতে মোট ৯ কোটি ৭ লাখ টাকার বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অসঙ্গতি ও হিসাবগত দুর্বলতা ধরা পড়েছে। এসব অনিয়ম মূলত বিনিয়োগ, এফডিআরের সুদ, অগ্রিম আয়কর, পরিচালন ব্যয়, স্থায়ী সম্পদ, অগ্রিম অর্থ এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানের হিসাব সংক্রান্ত বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-তে সংরক্ষিত ১৮টি এফডিআরের বিপরীতে ৯০ শতাংশ লিয়েন প্রদান করে ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করে। এর ফলে কোম্পানিটি তাদের আর্থিক বিবরণীতে এফডিআরের কোনো অর্জিত সুদ দেখায়নি। অথচ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ওই এফডিআরের বিপরীতে ১৭ লাখ ৭৯ হাজার টাকা সুদ জমা হয়েছিল। নিরীক্ষকদের মতে, এ কারণে কোম্পানির সম্পদের মূল্য ১৭ লাখ ৭৯ হাজার টাকা কম দেখানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অধিকাংশ অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে সহযোগী প্রতিষ্ঠান সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডে। প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা মূল্যের স্থায়ী সম্পদের কোনো যথাযথ স্থায়ী সম্পদ নিবন্ধন (ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টার) সংরক্ষণ করেনি, যা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে।

শেয়ার বিনিয়োগের হিসাবেও উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বছরের ৪৩ লাখ টাকা অবাস্তবায়িত লোকসান চলতি বছরের ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার বিনিয়োগের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছর আরও ২৭ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবাস্তবায়িত লোকসান হিসাবভুক্ত করা হয়েছে। নিরীক্ষকদের মতে, আগের বছরের লোকসান চলতি বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করায় চলতি বছরের লোকসান ৪৩ লাখ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে।

অগ্রিম আয়কর হিসাবেও গরমিল পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের শেষে অগ্রিম আয়করের স্থিতি ছিল ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, কিন্তু ২০২৫ সালের শুরুতে তা ২ কোটি ৩ লাখ টাকা হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা পার্থক্য সৃষ্টি হলেও এর পক্ষে কোম্পানি কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বা প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি।
‘অ্যাডভান্স টু সিকিউরিটি হাউস’ হিসাবেও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষকরা। আর্থিক বিবরণীতে এই হিসাবে ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা দেখানো হলেও চলতি বছরে কোম্পানি ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা লোকসান হিসেবে লিখে ফেলেছে। অথচ সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে প্রকৃত স্থিতি পাওয়া গেছে মাত্র ৩৩ হাজার ৭০০ টাকা।
এফডিআরের সুদের হিসাবেও অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে। নিরীক্ষকদের হিসাবে অর্জিত সুদের পরিমাণ হওয়ার কথা ছিল ১৮ লাখ ৫ হাজার টাকা, কিন্তু আর্থিক বিবরণীতে দেখানো হয়েছে ২৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা। ফলে সুদের পরিমাণ ৬ লাখ ১৪ হাজার টাকা বেশি দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১ লাখ ৫১ হাজার টাকা গ্রাহক পাওনা (পেয়েবল টু ক্লায়েন্টস) এবং ৫ লাখ টাকা সাবস্ক্রিপশন প্রদেয় (সাবস্ক্রিপশন পেয়েবল)-এর পক্ষে পর্যাপ্ত সমর্থনকারী নথি পাওয়া যায়নি।
পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও নথিপত্রের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে বেতন ও ভাতা বাবদ ৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, আইটি ও টেলিফোন ব্যয় ১ লাখ ২১ হাজার টাকা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা এবং বিবিধ ব্যয় ৮ লাখ টাকা-এর যথাযথ প্রমাণাদি নিরীক্ষকদের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি।
এছাড়া দুটি অগ্নি বীমা এবং একটি মেরিন কার্গো বীমার দাবি প্রিমিয়াম আয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে, যা প্রচলিত হিসাব পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবিতরিত বা অনাদায়ী লভ্যাংশের হিসাবেও অমিল ধরা পড়েছে। কোম্পানি বছরের শেষে ১৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা অবিতরিত লভ্যাংশ দেখালেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে ছিল ১৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ফলে ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা পার্থক্য পাওয়া গেছে। নিরীক্ষকদের মতে, অবিতরিত লভ্যাংশের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের স্থিতি একই হওয়া উচিত ছিল।
স্বাধীন নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এফডিআরের সুদের ভুল হিসাব, শেয়ার বিনিয়োগে অসঙ্গতি, অগ্রিম আয়করের গরমিল, স্থায়ী সম্পদের যথাযথ নিবন্ধন না রাখা, অগ্রিম অর্থ ও বিনিয়োগের হিসাবের অমিল, পরিচালন ব্যয়ের পর্যাপ্ত নথির অভাব, বীমা দাবির হিসাব সমন্বয়ে প্রশ্ন এবং অবিতরিত লভ্যাংশের ব্যাংক হিসাবের অসামঞ্জস্য—সব মিলিয়ে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামসুল হুদা’র বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করলেও পরবর্তীতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন আর সোনার বাংলা ক্যাপিটাল এর এমডি মোহাম্মদ তানভীর কে ফোন দিলে ফোন রিসিভ না কারার ফলে এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বীমা খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশের বীমা খাতে জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রতিটি বীমা কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাদের ভাষ্য, যদি একের পর এক আর্থিক অনিয়ম, হিসাবগত অসঙ্গতি ও নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সামনে আসতে থাকে, তবে দেশের বীমা শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি এ খাতের টেকসই উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট মহল আরও মনে করে, সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের আর্থিক লেনদেন ও তহবিল ব্যবহারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত। অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণই হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

তথ্যসূত্র: ফাইন্যান্স টুডে