স্লিপার বাস বন্ধ নয়, নিরাপদ ও যুগোপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান

প্রকাশিত: ৯:১৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্লিপার বাস বন্ধ না করে প্রয়োজনীয় কারিগরি মানদণ্ড, নিরাপত্তা বিধিমালা, নিয়মিত ফিটনেস ও টেকনিক্যাল পরিদর্শনের আওতায় এনে এ সেবাকে আরও নিরাপদ ও যুগোপযোগী করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)তে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দেশের দীর্ঘপথের যাত্রীদের জন্য স্লিপার বাস একটি সময়োপযোগী, আরামদায়ক ও আধুনিক পরিবহনসেবা। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন দূরপাল্লার রুটে স্লিপার বাস চলাচল করছে এবং এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি আফতাব উদ্দিন মাসউদ, সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবু, কার্যকরী সভাপতি মাহাবুব আলম প্রধান জুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক কোসির উদ্দিন রাজু এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জিতু বক্তব্য দেন। এ সময় মো. সাইদুর রহমান সুমন, মাওলানা ইব্রাহিম, মো. দাউদুর রহমান ও মো. মুস্তাফিজুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে স্লিপার বাস নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা, প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা এসব উদ্বেগকে অস্বীকার না করে যাত্রীনিরাপত্তা, যানবাহনের মান এবং বিদ্যমান আইন মেনে চলার বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান। তবে কোনো ব্যবস্থায় সমস্যা থাকলে পুরো সেবা বন্ধ না করে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও কারিগরী মানদণ্ড নির্ধারণের মাধ্যমে সেটিকে নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।

তাদের মতে, বাংলাদেশের দীর্ঘপথের রুটে একজন যাত্রীকে অনেক সময় ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা বাসে অবস্থান করতে হয়। কক্সবাজার, সিলেট, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী গন্তব্যে দীর্ঘ সময় সাধারণ সিটে ভ্রমণ অনেক যাত্রীর জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে। স্লিপার বাস যাত্রীদের শুয়ে বা আরামদায়ক অবস্থায় দীর্ঘপথ ভ্রমণের সুযোগ করে দেয়। রাতে যাত্রা করে সকালে গন্তব্যে পৌঁছানোর ফলে কর্মজীবী মানুষের সময়ও সাশ্রয় হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, স্লিপার বাস শুধু যাত্রীসেবা নয়, এর সঙ্গে চালক, সহকারী, কাউন্টার কর্মী, মেকানিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, টিকিটিং কর্মী, কল সেন্টার কর্মী, রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। পাশাপাশি বাস নির্মাণ, বডি ওয়ার্ক, ব্র্যান্ডিং, এসি ও ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম, ইন্টেরিয়র, সফটওয়্যার ও টিকিটিংসহ বিভিন্ন খাতও এ পরিবহনসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

বক্তারা আরও বলেন, স্লিপার বাসের দুর্ঘটনার হার অত্যন্ত কম এবং দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনাও খুবই বিরল। তবে যেকোনো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আরও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারিগরি মানদণ্ড ও অনুমোদন প্রক্রিয়া, বাসের বডি ও উচ্চতা-ওজনের নিরাপদ সীমা, কেবিনের আকার, যাত্রী ধারণক্ষমতা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং নিয়মিত ফিটনেস ও টেকনিক্যাল পরিদর্শনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

এছাড়া প্রশিক্ষিত চালক নিয়োগ, দীর্ঘ রুটে প্রয়োজন অনুযায়ী চালক পরিবর্তন, অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত মান পূরণ না করা যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা স্পষ্ট করে বলেন, তারা কোনোভাবেই নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করতে চান না। যে বাস কারিগরিভাবে অনিরাপদ, সেটি স্লিপার হোক বা সাধারণ—তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির বাসের সমস্যা পাওয়া গেলে পুরো সেবাটিকে বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়।

তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের প্রতি স্লিপার বাসের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান। ওই নীতিমালার আওতায় যেসব স্লিপার বাস নির্ধারিত নিরাপত্তা মান পূরণ করবে, তাদের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়ার এবং যারা মান পূরণ করতে পারবে না, তাদের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়।

বক্তারা বলেন, প্রযুক্তি ও মানুষের চাহিদার সঙ্গে পরিবহনব্যবস্থাও পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় এসি বাস ছিল বিলাসিতা, বর্তমানে তা সাধারণ পরিবহনব্যবস্থার অংশ। একইভাবে দীর্ঘপথের যাত্রীদের আরাম, সময় ও ব্যক্তিগত পরিসরের প্রয়োজন থেকেই স্লিপার বাসের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে।

তাদের প্রত্যাশা, ‘সেবা বন্ধ নয়, সেবার মান নির্ধারণ’—এই নীতির ভিত্তিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্লিপার বাস পরিচালনার জন্য যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন যাত্রীদের নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে পরিবহন খাতের কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগও অব্যাহত থাকবে।

সংবাদ সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি বিনীত আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, “স্লিপার বাস বন্ধ করবেন না। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড ও নীতিমালা তৈরি করে আমাদের নিয়মের মধ্যে চলার সুযোগ দিন।”

বক্তারা বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য সরকারের বিরোধিতা করা নয়; বরং নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যাত্রী এবং আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা। দুর্ঘটনার বিচার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্লিপার বাসের ভবিষ্যৎ যেন শুধু একটি দুর্ঘটনা বা নামের কারণে নির্ধারিত না হয়—এ বিষয়েও তারা সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তাদের প্রত্যাশা—সবার জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক ও আধুনিক যাত্রা নিশ্চিত হবে এবং যথাযথ নীতিমালার মাধ্যমে স্লিপার বাস দেশের পরিবহনব্যবস্থায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।